Skip to content
Dhaka32°C
YouTubeFollow
LIVEবিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতনএআই ব্যবহার করে টিকা তৈরির দাবি কেমব্রিজের গবেষকদেরআইভীর বাড়ির সামনে কর্মীর ভিড়, সিসি ক্যামেরায় নজরদারিগুলশানে স্পা সেন্টারে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, গ্রেফতার ২৮মা-বাবার অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতি, যা বলেছে ইসলামমার্কিন ট্রেজারিকে টপকে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ সম্পদ এখন স্বর্ণবাংলাদেশে বিশ্বকাপের খেলা দেখা যাবে যে ৩ চ্যানেলেডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার, হতাহতের ঘটনা ঘটেনি

যে আর্জেন্টাইন বদলে দিয়েছিলেন ব্রাজিলের ফুটবল ভাবনা

‘আপনারা আমার ছবি না তুলে এই ভদ্রলোকের ছবি তুলুন’, ১৯৬৫ সালে এজেইজা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশে এমনটাই বলেছিলেন পেলে। তখন তিনি ছিলেন নিজের ক্যারিয়ারের শীর্ষে, চারপাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ভেসে যাচ্ছিল সেই মুহূর্ত।

কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি আলোটা সরিয়ে দিলেন পাশে অপেক্ষায় থাকা আর্জেন্টিনার আন্তোনিও সাস্ত্রের দিকে!
ফুটবল ইতিহাসে তিনি এমন একজন, যাকে নিয়ে খুব বেশি শোরগোল হয়নি। কিন্তু যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল অনেক দূর।

বিশেষ করে ব্রাজিলের ফুটবল চিন্তাভাবনায়। সেই সময় সান্তোস দল আর্জেন্টিনা সফরে ছিল।
বিমানবন্দরে ভিড় আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন পেলে। কিন্তু সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে ক্লাবের সাবেক তারকা আন্তোনিও সাস্ত্রে।
তিনি এসেছিলেন এক প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানাতে। সঙ্গে ছিল তার ছেলেও।

১৯১১ সালের ২৭ এপ্রিল আর্জেন্টিনার লোমাস দে জামোরা শহরে জন্ম সাস্ত্রের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি টান। ১৯২৯ সালে তিনি খেলতে শুরু করেন প্রোগ্রেসিস্তা ক্লাবে। তখন সেটা ছিল দ্বিতীয় বিভাগের একটি দল। সেই ক্লাবেই এক মৌসুমের পারফরম্যান্সে তিনি দ্রুত নজর কাড়েন। ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তের তৎকালীন তারকা ম্যানুয়েল সেওয়ানে তাকে ট্রায়ালে ডেকে নেন। শুরুতে খেলেন রিজার্ভ দলে, তবে খুব অল্প সময়েই জায়গা করে নেন মূল একাদশে। এরপর তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

যে আর্জেন্টাইন বদলে দিয়েছিলেন ব্রাজিলের ফুটবল ভাবনা

ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তের সোনালি অধ্যায়
ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তেতে যোগ দেওয়ার পরই সাস্ত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত ক্লাবটির হয়ে খেলেন ৩৪১টি ম্যাচ, যা এখনো তাকে ক্লাবের সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের তালিকায় শীর্ষ দশের মধ্যে রেখেছে। ১১২ গোল নিয়ে আছেন ক্লাব ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায়।

সে সময়ের ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে ছিল আক্রমণনির্ভর, ভয়ংকর শক্তিশালী এক দল। ভিসেন্তে দে লা মাত্তা আর আর্সেনিও এরিকোর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে মিলে সাস্ত্রে গড়ে তোলেন এক দুর্দান্ত আক্রমণত্রয়ী, যা আর্জেন্টাইন ফুটবলে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল।

পজিশন নয়, প্রয়োজনই ছিল তার পরিচয়
সাস্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মাঠে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি মূলত খেলতেন বাম দিকের মাঝমাঠে, আজকের ফুটবলে যেটা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা উইঙ্গারের মতো একটি ভূমিকা। কিন্তু শুধু একটি জায়গায় আটকে থাকাই তাঁর খেলার ধরন ছিল না। দলের প্রয়োজনে তিনি প্রায় যেকোনো পজিশনে নেমে দায়িত্ব নিতে পারতেন।

কখনো ডিফেন্সে নেমে খেলাকে গুছিয়ে দিয়েছেন, কখনো মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে দুইবার গোলরক্ষকের দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাঁকে। ফুটবল ইতিহাসে এমন খেলোয়াড় খুব কমই পাওয়া যায়। যিনি এত স্বাভাবিকভাবে মাঠের সব জায়গায় মানিয়ে নিতে পারতেন।

ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই টার্নিং পয়েন্ট ম্যাচ
মাত্র ৩৪ ম্যাচ খেলেই সাস্ত্রে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেন। খুব দ্রুতই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ১৯৩৭ সালের দক্ষিণ আমেরিকা চ্যাম্পিয়নশিপে তার পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। সেই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের শক্তিশালী আক্রমণ সামলাতে কোচ ম্যানুয়েল সেওয়ানে তাঁকে এক ম্যাচে ডান দিকের ডিফেন্ডার হিসেবে খেলান। দায়িত্বটা সহজ ছিল না। তার সামনে ছিলেন ব্রাজিলের ভয়ংকর আক্রমণ জুটি টিম ও পাটেস্কো।

কিন্তু সাস্ত্রে সেই কঠিন দায়িত্বটা এমনভাবে সামলান যে ম্যাচের পুরো চিত্রই বদলে যায়। তাঁর দৃঢ়তা আর বুদ্ধিদীপ্ত খেলায় ব্রাজিলকে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয় আর্জেন্টিনা। পরে সেই টুর্নামেন্টেই তারা শিরোপাও জিতে নেয়।

সাও পাওলোতে নতুন অধ্যায়
ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তেতে টানা ১২ বছর কাটানোর পর সাস্ত্রের ক্যারিয়ারে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। বয়স বাড়ছিল, ক্লাবও আর আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছিল না। অনেকের চোখে তার সেরা সময় পেরিয়ে গেছে। ঠিক তখনই নতুন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে ব্রাজিলে পাড়ি জমান তিনি। যোগ দেন সাও পাওলোতে। সে সময় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে করিন্থিয়ান্স ও পালমেইরাসের দাপট। সাও পাওলো খুঁজছিল এমন একজন ফুটবলার, যিনি দলটিকে নতুন করে পরিচিতি এনে দিতে পারেন।

শুরুটা অবশ্য সহজ ছিল না। ফুটবল ইতিহাসবিদ এস্তেবান বেকারমানের ভাষায়, “প্রথম দিকে সমস্যা হয়েছিল, কারণ তাকে অনেক বেশি অনুশীলন করানো হচ্ছিল। তিনি সেই ধরনের ট্রেনিংয়ে অভ্যস্ত ছিলেন না।”

তবে সাস্ত্রে দ্রুতই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। নিজের মতো করে প্রস্তুতির ছন্দ খুঁজে নেন তিনি। আর অল্প সময়ের মধ্যেই মাঠে তার প্রভাব চোখে পড়তে শুরু করে।

সাও পাওলোতে বিস্ফোরণ
সাও পাওলোতে মানিয়ে নিতে খুব বেশি সময় নেননি সাস্ত্রে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের একজন। তার সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচগুলোর একটি ছিল পোর্তুগেসা সান্তিস্তার বিপক্ষে। সেদিন ৯-০ গোলের বিশাল জয়ে একাই ছয় গোল করেছিলেন তিনি।

সাস্ত্রের আগমনে বদলে যেতে শুরু করে সাও পাওলোর ভাগ্যও। তার নেতৃত্বে দলটি ১২ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে পলিস্তাঁ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে। এরপর ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালেও শিরোপা ধরে রাখে তারা। এই সাফল্যই সাস্ত্রেকে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে অনন্য এক জায়গা এনে দেয়। ধীরে ধীরে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন দেশটির ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বড় বিদেশি তারকা হিসেবে।

পেলের শৈশবের অনুপ্রেরণা
সাস্ত্রের প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তার একটি জনপ্রিয় গল্প আজও ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ঘুরে বেড়ায়। বলা হয়, পেলের বাবা ডনদিনহো একদিন ছোট্ট পেলেকে বলেছিলেন, “তুমি যদি কোনো দিন আন্তোনিও সাস্ত্রের মতো খেলতে পারো, আমি খুশি হব। অন্তত তার অর্ধেক হলেও চলবে।”

গল্পটি সত্য হোক বা কিংবদন্তির অংশ, একটি বিষয় স্পষ্ট; সাস্ত্রের নাম তখন ব্রাজিলের ফুটবল অঙ্গনে কতটা শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। এমনকি যে ছেলেটি পরে ফুটবলের রাজা হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর বেড়ে ওঠার গল্পেও জায়গা করে নিয়েছিলেন এই আর্জেন্টাইন।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নতুন দর্শনের সূচনা
ব্রাজিলে সাস্ত্রের প্রভাবের কথা বলতে গেলে ফুটবলের দর্শন বদলে দেওয়ার কথাও বলতে হয়। সে সময় ব্রাজিলে প্রতিভার কোনো অভাব ছিল না। অসাধারণ ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে তারা ছিল অনন্য। কিন্তু খেলার মধ্যে কৌশলগত শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।

সাস্ত্রে এসে সেই জায়গাতেই প্রভাব ফেলেন। তিনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে যোগ করেন পরিকল্পনা, দায়িত্ববোধ এবং ফলাফল আদায়ের মানসিকতা। নৈপুণ্যকে কীভাবে দলের সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়, সেটাও দেখিয়ে দেন।

অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয় বদলে যায়নি, বরং আরও পরিপূর্ণ হয়েছে। শৈল্পিকতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কার্যকারিতা। আর সেই পরিবর্তনের পেছনে আন্তোনিও সাস্ত্রের নামও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে।

এক নীরব বিপ্লবীর উত্তরাধিকার
ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যারা শুধু গোল করেন না, ট্রফি জেতেন না। তারা খেলার ধরণ, চিন্তাভাবনা আর সংস্কৃতির ওপরও ছাপ রেখে যান। আন্তোনিও সাস্ত্রে ছিলেন তেমনই একজন। তিনি কখনো ব্রাজিলের জার্সি গায়ে চাপাননি। ব্রাজিলের পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্বও তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফুটবল যে পথ ধরে পরিণতির দিকে এগিয়েছে, সেই পথের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র ছিলেন তিনি। তাই ১৯৬৫ সালে এজেইজা বিমানবন্দরে পেলের সেই মন্তব্যকে নিছক সৌজন্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেটি ছিল একজন কিংবদন্তির পক্ষ থেকে আরেক কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা।

এজেইজা বিমানবন্দরের এ্ ঘটনার দুই বছর পর ব্রাজিলের প্রখ্যাত কোচ ওসওয়ালদো ব্রান্ডাও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ব্রাজিলিয়ানরা আর্জেন্টিনাকে অনুকরণ করতে চায়, অথচ তারা ভুলে যায়, একজন আর্জেন্টাইনই একসময় আমাদের ফুটবল শিখিয়েছিলেন। তার নাম আন্তোনিও সাস্ত্রে।” কথাটা বড় শোনালেও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল ইতিহাসে এটি ধ্রুব সত্য।